ads

জনসংখ্যা বাড়ার বদলে শিশুদের সংখ্যা কমতে থাকায় লন্ডনের শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। জন্মহার হ্রাসের পাশাপাশি ব্রেক্সিট, মহামারি ও বাড়িভাড়ার উচ্চমূল্য পরিবারগুলোর বসবাসের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। এরই মধ্যে বহু স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, আর কিছু ভবনকে অন্য কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে স্থানীয় কাউন্সিলগুলো।

যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে ২০১৯ সালের পর থেকে ৯০টির বেশি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সংগঠন লন্ডন কাউন্সিলসের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীসংখ্যা কমে যাওয়ায় স্কুলগুলো চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। পূর্ব লন্ডনের হ্যাকনিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া দুটি স্কুল ভবন গৃহহীন মানুষের অস্থায়ী আবাস হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্য অনেক স্কুলও বন্ধ হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

লন্ডনে জন্মহার কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্রেক্সিট, করোনাভাইরাস মহামারি এবং আবাসনের উচ্চমূল্যের কারণে অনেক পরিবার অন্য এলাকায় চলে গেছে। ফলে স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। এই প্রবণতা আগামী বছরগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

হ্যাকনি এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মহামারির আগের তুলনায় শিক্ষার্থীসংখ্যা ইতিমধ্যে ১৫ শতাংশ কমেছে। ২০২৪-২৫ থেকে ২০২৯-৩০ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে এ সংখ্যা আরও ১৪ শতাংশ কমতে পারে। পাশের আইলিংটন এলাকায় শিক্ষার্থী কমার হার হতে পারে পুরো ইংল্যান্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ, প্রায় ২২ শতাংশ।

আইলিংটন কাউন্সিলের নেতা উনা ও’হ্যালোরান বলেন, ‘এমন একটি প্রজন্ম আসছে, যারা হয়তো সন্তানই নেবে না, অথবা নিলেও কেবল একটি সন্তান নেবে। এটা সত্যিই দুঃখজনক। শহরে শিশুদের প্রয়োজন।’

শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় স্কুল বন্ধ হলে সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কীভাবে অন্য স্কুলে স্থানান্তর করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুল ভবনগুলো কী কাজে ব্যবহার করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে এমন কিছু ভবন রয়েছে, যেখানে ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিশুদের শিক্ষাদান করা হয়েছে।

হ্যাকনিতে গত দুই বছরে আটটি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়েছে। গ্রিন পার্টি পরিচালিত হ্যাকনি কাউন্সিলের শিশুবিষয়ক মন্ত্রিপরিষদ সদস্য সোরায়া আদেজারে বলেন, স্কুলগুলো শিশুদের শিক্ষাদানের পরিবর্তে গৃহহীন মানুষের আবাসে পরিণত হওয়াটা কিছুটা হতাশাজনক। তবে এর মাধ্যমে গৃহহীন পরিবারগুলো অন্তত নিজেদের পরিচিত এলাকায় থাকার সুযোগ পাচ্ছে।

স্কুল ভবনগুলোকে বিকল্প কাজে ব্যবহারের প্রক্রিয়া অবশ্য সহজ নয়। বর্তমানে স্কুল ভবন অন্য কাজে ব্যবহার করতে হলে স্থানীয় কাউন্সিলগুলোকে সরকারের অনুমতি নিতে হয়। আইলিংটন কাউন্সিলের নেতা উনা ও’হ্যালোরানের ভাষায়, অনুমতির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠিন এবং ধীরগতির।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রায় অর্ধেক সরকারি স্কুল পরিচালনা করে স্থানীয় কাউন্সিলগুলো। কিন্তু একাডেমি স্কুলগুলো যাতে অন্য স্কুল থেকে শিক্ষার্থী টেনে নিয়ে সেগুলোকে বন্ধ হওয়ার দিকে ঠেলে না দেয়, তা নিশ্চিত করার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা কাউন্সিলগুলোর হাতে নেই।

ইংল্যান্ডে একাডেমি স্কুলগুলো নিজেদের ভর্তি প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পরিচালনা করতে পারে। স্কুল সম্প্রসারণের সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সংস্কার ও পরিচালনব্যবস্থাকে ভালো ফলাফলের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় একাডেমিগুলোর বিস্তার অন্য স্কুলগুলোর টিকে থাকার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে উঠতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্থানীয় কাউন্সিলগুলো।

সম্প্রতি পাস হওয়া ‘চিলড্রেনস ওয়েলবিয়িং অ্যান্ড স্কুলস অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে একাডেমি স্কুলগুলোর স্বায়ত্তশাসন সীমিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি। এর মধ্যে একাডেমিগুলোর সম্প্রসারণের প্রস্তাবে আপত্তি জানানোর ক্ষমতা কাউন্সিলগুলোকে দেওয়া হয়েছে। জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট উদ্বেগ থেকেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন লেবার পার্টির এক নেতা।

তবে সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সময় থেকে একাডেমি স্কুলগুলোর প্রতি যে সর্বদলীয় সমর্থন ছিল, বর্তমান সরকার সেখান থেকে সরে আসছে।

শিক্ষার্থীসংখ্যা কমার প্রভাব শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিগগিরই মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোও এর মুখে পড়তে পারে। ইংল্যান্ডে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসংখ্যা ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়লেও আগামী বছর থেকে তা কমতে শুরু করবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।

ভবিষ্যতে জন্মহার আবার বাড়লে এসব স্কুল ভবনের প্রয়োজন হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে স্থানীয় কাউন্সিলগুলো আপাতত খালি ভবনগুলো বিক্রি করে দিচ্ছে না। তবে শিশু জন্মের হার কমার প্রবণতা থামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ২০১২ সাল থেকে দেশটিতে প্রজনন হার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে নারীপ্রতি ১ দশমিক ৩৯ সন্তানে দাঁড়িয়েছে।

শিশু জন্মের হার কমে যাওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে ইংল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থান এখনো শক্তিশালী। প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কর্মসূচি পিসার (পিআইএসএ) হিসাবে, ইংল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে।

সূত্র: দ্য টাইমস

আরও খবর