পনেরোই আগস্ট একটি কালো অধ্যায়
জাতীয় বিশাসঘাতকতা ও রাজনৈতিক অপরাধের কারণে ১৯৭৫- এর ১৫ আগস্ট সারা বিশ্বের কাছে যুগে যুগে এটি একটি নিন্দিত দিন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে । পনেরো আগস্ট সব সময় আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় জাতি হিসেবে আমরা কেমন হিংস্রতার পরিচয় দিতে পারি । এছাড়া আমরা কত বড় বিশ্বাসঘাতক হতে পারি ! না হলে কি করে আমরা আমাদের স্বাধীনতার স্তপতিকে হত্যা করতে পারি । এই দিনটিকে একটি জঘন্য দিন বলা হলেও কম হবে কারণ এই দিনে বিশ্বের সকল সুস্হ চিন্তার মানুষ হতবাক হয়েছিল। এই দিন এলে সীমাহীন কষ্ট অনুভব করেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সহ যারা এই দিনে তাদের আত্মীয়স্বজন হারিয়েছেন । এই কষ্ট কত কঠিন তা বুঝার ক্ষমতা শুধু তাদের এই আছে, যারা ঘাতকের বুলেটে তাদের আত্মীয়স্বজনকে খুন হতে দেখেছেন । তাই বলতে চাই যে বেদনা তারা
সইছেন । আমরা সবাই সেটি পারব না। বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের যে ধৈর্য্য আছে তা সবার আছে বলে মনে হয় না। আর বঙ্গবন্ধু ভক্ত মানুষের কাছেও এই দিনটি অত্যন্ত বেদনার দিন বলা যায় । আসুন আমরা জেনে নেই এই দিনে কি নির্মম ঘটনা ঘটেছিল বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এর বাড়িতে, হুমায়ূন আহমেদ এর দেয়াল উপন্যাস এর মাধ্যমে জানা যায় , হরিদাস শেষরাতে তার দোকানে গুমাচ্ছিল । হঠাৎ ঘুম ভাঙল। মড়মড় শব্দ হচ্ছে দোকান ভেঙে পড়ছে । সে তখন ভূমিকম্প হচ্ছে ভেবে দৌড়ে দোকান থেকে বেড় হয়ে হতভম্ব। আলিশান এক ট্যাংক তার দোকানের সামনে ঘুরছে। ট্যাংকের ধাক্কায় তার দোকান ভেঙে পড়ে যাচ্ছে। ট্যাংকের ঢাকনা খোলা । দুজন কালো পোশাকের মানুষ দেখা যাচ্ছে । দোকান ভেঙে ফেলার জন্য কঠিন কিছু কথা হরিদাশের মাথায় এসেছিল । সে কোন কথা বলার আগেই ট্যাংকের পেছনের ধাক্কায় পুরো দোকান তার মাথায় পড়ে গেল। ফজরের আজানের ধ্বনির সঙ্গে নিতান্তই বেমানান কিছু কথা বঙ্গবন্ধুকে বলছে এক মেজর, তার নাম মহিউদ্দিন। এই মেজরের হাতে ছিল স্টেনগান। আর বঙ্গবন্ধুর হাতে ছিল পাইপ। তাঁর পরনে পাঙ্গাবি এবং ধূসর চেক লুঙ্গি। শেখ মুজিব বললেন, তোমরা কি চাও? মেজর বিব্রত ভঙ্গিতে আমতা-আমতা করতে লাগল। বঙ্গবন্ধুর কঠিন ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু আবার বললেন, তোমরা চাও কি? মেজর মহিউদ্দিন বলল, স্যার, একটু আসুন। কোথায় আসব? মেজর আবারও আমতা-আমতা করে বলল, স্যার, একটু আসুন। বঙ্গবন্ধু বললেন, তোমরা কি আমাকে খুন করতে চাও। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে কাজ করতে পারেনি, সে কাজ তোমরা করবে? এই সময় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে ছুটে এল মেজর নূর। বঙ্গবন্ধু তার দিকে ফিরে তাকানোর আগেই সে ব্রাশফায়ার করল। তখন ভোর পাঁচটা চল্লিশ। বঙ্গপিতা মহামানব শেখ মুজিব সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়লেন। তখনো বঙ্গবন্ধুর হাতে তাঁর প্রিয় পাইপ।
কেন এই ঘটনা ঘটেছিল সেদিন ? এ বিষয়ে কিছু আলোচনা করার চেষ্টা করিব। মূলত দেশ স্বাধীনের পর ’৭২ এর সংবিধানের আলোকে যখন বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছিল । তখনো বসে থাকেনি স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি। গোপনে গোপনে দেশের সংবিধানকে ও মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলোকে তারা পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নিতে পিছ পা হয়নি । আর মুক্তিযুদ্ধের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর যখন ‘ফরমানের’ দ্বারা প্রথমে মোশতাক ও পরে সামরিক শাসক জিয়া এবং এরশাদ বদলে দেয় ’৭২ -এর সংবিধানের মৌল চরিত্র ও ভিত্তি। সংবিধান থেকে তারা বাদ দেয় ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের নীতি । তখনি তা পরিষ্কার হয়ে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যেহেতু ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড একটি রাজনৈতিক অপরাধের ঘটনা ছিল সেহেতু আগে-পরে সংশ্লিষ্ট থাকতেই পারে পাকিস্তান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার দেশসহ কিছু বিদেশি শক্তি। ঘটনার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচার করেছিল এবং বাংলাদেশকে তারা ইসলামী প্রজাতন্ত্র বলেও আখ্যায়িত করা শুরু করেছিল। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সম্পৃক্ততা তার তথ্য প্রমাণসমেত অনেক দলিল-পত্র ইতিমধ্যে প্রাকাশ পেয়ে গেছে। এসব কিছু পর্যালোচনা করলে তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে এর সাথে জড়িত ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা ষড়যন্ত্রমূলক শক্তি ও উপাদান । এছাড়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা স্বত্বেও যখন একটি দেশ স্বাধীন হয়েই যায়, তখন পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তিসমূহ বাংলাদেশকে তাদের কবজায় রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে । আর শেখ মুজিবকে ক্ষমতায় রেখে বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না । তাই হয়তো তারাও এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকতে পারেন এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নেই । আবার কেউ কেউ এই অভিমত দেন , অর্থনৈতিক দুর্বলতা, দুর্নীতি,আইনশৃঙ্খলার অবনতি , চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, রক্ষীবাহিনীর বাড়াবাড়ি,সেনাবাহিনীদের মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্হান ,বাকশাল গঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের মধ্যে অনেক্য ইত্যাদি কারণেও এই ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে । যাই ইউক যিনি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হয়েও জেনারেল সফিউল্লাহর সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ কালে যখন জানালেন , তোমার ফোর্সআমার বাড়ি এটাক করেছে, কামালকে বোধ হয় মেরে ফেলেছে, তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও । তখন সে বলেছিল, আই অ্যাম ডুয়িং সামথিং। ক্যান ইউ গেট আউট অব দ্য হাউস।? তার এই ইংরেজি উত্তরটা ছিল কতটা ঔদ্বত্তপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখেনা । রাষ্ট্রের জনকের জীবন যাচ্ছে সেখানে কেউ বিব্রত নয়। বঙ্গবন্ধুকে যখন সপরিবারে হত্যা করা হয় ঠিক তখন সেনা হেডকোয়ার্টার থেকে শীর্ষ কর্মকর্তারা তা প্রতিহত করার কোন চেষ্টা করেছেন বলে কোন প্রমাণ মিলেনি। বরং বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার কথা জেনেও জেনারেলরা রিলাক্স মুড-এ ছিলেন জানা যায় । তারপর মোশতাক সরকার গঠন করল । ১০ দিনের মধ্যে ডেপুটি প্রধান জিয়াউর রহমান হন সেনাপ্রধান এবং প্রমোশন পেয়ে ব্রিগেডিয়ার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ হন মেজর জেনারেল ও উপপ্রধান। সফিউল্লাহ হন রাষ্ট্রদূত । কি জঘন্যতম ইতিহাস আওয়ামী লীগের অনেক নেতা তখন নতুন মন্ত্রীসভায় নাম লেখান । ২ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত মোশতাকের কোন ক্ষমতাই ছিল না, ছিলেন প্রায় বন্দী। ৪ নভেম্বর খুনিরা নিরাপদে দেশত্যাগ করে। কিন্তু এই সময় যদি আওয়ামী লীগের লোকজন দেশের মানুষকে নিয়ে মোশতাক সরকারকে অবৈধ ঘোষণা দিয়ে সংবিধান অনুযায়ী উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে দিয়ে রাষ্ট্র গঠনের জন্য আন্দোলন করার চেষ্টা করতেন, তবে হয়তো তিনিরা বিদেশ যেতে পারতেন না । আর ইতিহাস ও সেই আওয়ামী লীগ নেতাদের ক্ষমা করতো ।
পরিশেষে বলব , এটি কোন সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয় । তাই এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হলেও আমরা বসে থাকতে পারিনা । এ থেকে কিছু শিক্ষা নেয়া উচিত। মীরজাফর যুগে যুগে সৃষ্টি হবে বা হতে পারে । তাই এই দেশের শত্রুদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে সব সময়। আর দেশ বিরোধীদের সাথে কোন রকম সম্পর্ক রাখার দরকার নেই । এরকম বিশ্বাসঘাতকদের নাম বাংলাদেশ থেকে চিরতরে মুছে আমাদেরকে শত্রুমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হবে । লেখকঃআজিজুল আম্বিয়া ,প্রাবন্ধিক ও গবেষক।
Email: azizul.ambya@yahoo.co.uk.






