হরমুজ থেকে পারমাণবিক কর্মসূচি: সুইজারল্যান্ড আলোচনায় কী পেল ওয়াশিংটন ও তেহরান
সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনার প্রথম ধাপ শেষে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তানের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপে একমত হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত থাকায় সামনের পথ সহজ হবে না।
সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্ন সংলগ্ন বার্গেনস্টকে টানা ১৮ ঘণ্টার বৈঠকে অংশ নেন দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
বৈঠক শেষে কাতার ও পাকিস্তান যৌথ বিবৃতিতে জানায়, সংঘাত এড়াতে একটি ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’, সরাসরি যোগাযোগ চ্যানেল এবং রাজনৈতিক তদারকির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির কাঠামো তৈরির কাজ তদারকি করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনাকে “খুবই সফল” উল্লেখ করে বলেন, দুই পক্ষ প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং একটি স্থায়ী সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত থাকবে কি না, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের পরিধি কতটা হবে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি কী হবে—এসব প্রশ্নের এখনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ ফেলো থমাস ওয়ারিক মনে করেন, রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়ে কারিগরি আলোচনা অনেক বেশি জটিল হবে এবং নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা অতিক্রম করতে পারে। বিশেষ করে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর তদারকি ও ইউরেনিয়াম ব্যবস্থাপনা নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
আলোচনায় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েও অগ্রগতি হয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে একটি বিশেষ যোগাযোগব্যবস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি প্রণালি থেকে মাইন অপসারণের জন্যও পৃথক সমন্বয় কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
লেবানন পরিস্থিতিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে এবং ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা কমাতে একটি ডি-কনফ্লিকশন সেল গঠন করা হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এটিকে লেবানন সংকট সমাধানের পথে বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করলেও পশ্চিমা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইরান দাবি করেছে, তাদের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে এবং জব্দ থাকা কিছু সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে নীতিগত অগ্রগতি হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত নিশ্চিত করেনি ওয়াশিংটন।
এদিকে পারমাণবিক ইস্যুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের আবারও ইরানে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র এটিকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আস্থা পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছে।
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, সুইজারল্যান্ড বৈঠক দুই দেশের দীর্ঘদিনের বৈরিতার অবসান ঘটানোর সুযোগ তৈরি করলেও সামনে কঠিন আলোচনা অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং কংগ্রেসের সম্ভাব্য আপত্তি—এসব বিষয় চূড়ান্ত সমঝোতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবুও কূটনৈতিক মহলে আশা করা হচ্ছে, আলোচনার এই নতুন ধারা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সূচনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।






