আপনার বাচ্চাকে নতুন স্কুলে সেটেল করবেন কিভাবে?
এ বছর একাডেমিক ইয়ারের এখন শেষ । আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে স্কুলগুলো আবার খুলবে। প্রতিবছর সেপ্টেম্বরে যে সব বাচ্চারা নতুন ষ্কুলে যায় তাদের মধ্যে অনেক বাচ্চাদের জন্য এই মাসটা চ্যালেঞ্জিং থাকে এবং অনেকেই বিভিন্ণ সমস্যার সম্মুখিন হয়। শুধুমাত্র বাচ্চারা না এই টার্মে আমরা অনেক অভিবাকদের কাছ থেকে ও বিভিন্ন ধরণের প্রশ্নের সম্মুখিন হই। বিশেষ করে যে সব বাচ্চারা নার্সারি থেকে নতুন স্কুলে প্রবেশ করে তাদের অধিকাংশ অভিবাবকদের মনে নানা ধরণের প্রশ্ন জাগে। তারা উদ্বিগ্ন থাকেন এ নিয়ে যে, তাদের বাচ্চারা কি ভাবে নতুন স্কুলে সেটেল হবে, বন্ধু বান্ধব কারা হবে, বাচ্চারা কি স্কুলের রুটিন ফলো করতে পারবে, বাচ্চা যদি স্কুলে সেটেল না হয় তাহলে তাদের কি করণীয়?
নতুন স্কুলে সেটেল হওয়া কিছু কিছু বাচ্চাদের জন্য বিরাট ব্যাপার এবং ঐ সময়টাকে তাদের অনেকেই চ্যালেঞ্জিং মনে করে। কিছু বাচ্চারা নতুন স্কুলে সেটেল হয় খুব তাড়াতাড়ি আবার অনেক বাচ্চাদের কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে ।যে সব বাচ্চাদের নতুন স্কুলে সেটেল হতে সময় লাগে তারা বিভিন্ন সমস্যায় ভূগে। যেমন; স্কুলে নিজেকে একা মনে করে, পুরোনো স্কুল/নার্সারি এবং বন্ধু বান্ধবদের মিস করে, নতুন ক্লাস মেইট, শিক্ষক ও স্কুলের ভেতরের পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে কষ্ট হয় এবং নতুন ক্যারিকুলামের সাথে পরিচিত হতে সমস্যা হয় ।
উপরোক্ত সমস্যাগুলোর জন্য অনেক সময় দেখা যায় অনেক বাচ্চারা স্কুলে যেতে অনিহা প্রকাশ করে এবং বিভিন্ন ধরণের আচরণ করে । যেমন; সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যেতে চায় না, কান্নাকাটি করে বাহানা করে পেট ব্যথা, মাথা ব্যথা বা বমিভাব ইত্যাদি। আবার যারা কান্নাকাটি করে ষ্কুলে যায় তারা অন্যের সাথে কথা বলতে চায় না, ক্লাসের লেসনে মনোযোগী হয়না নিজেকে গুটিয়ে রাখে। স্কুলে সেটেল হতে সমস্যা হওয়া বাচ্চাদের অধিকাংশ অভিবাবকরা ঐ সময়ে হতাশায় ভূগেন এবং নানা ধরণের দু; চিস্তায় থাকেন। বাচ্চাকে রেখে বাড়ীতে তাদের মন বসে না উদ্বিগ্ন থাকেন কখন ফোন আসে স্কুল থেকে এ নিয়ে।
যে সব অভিবাবকরা তাদের বাচ্চাকে নতুন স্কুলে সেটেল করা নিয়ে দু;চিন্তায় ভুগেন, আমরা বিভিন্ন ভাবে তাদেরকে সাহায্য করার চেষ্টা করি। আমাদের সেটিং থেকে যে সব বাচ্চারা নতুন স্কুলে যায় তাদের অভিবাবকরা কিভাবে তাদের বাচ্চাদের স্কুলে যাবার পূর্বে মানসকিভাবে তৈরি করবেন এবং বাচ্চা স্কুলে সেটেল হতে যদি কোন সমস্যা হয় তা হলে তারা কি কি টিপস ব্যবহার করবেন তার উপর ওয়ার্কশপ করে সার্পোট করি। আমাদের ওয়ার্কশপের মাধ্যেমে অনেক অভিবাবকরা উপকৃত হন। বাচ্চাকে নতুন স্কুলে মানসকিভাবে তৈরি করতে আমরা যে টিপসগুলো ওয়ার্কশপের মধ্যেমে অভিবাবকদের দেয়ে থাকি তার কিছু অংশ নীচে দেওয়া হলো-
১) আপনার বাচ্চার সাথে একান্তে প্রতিদিন কিছুটা সময় নতুন স্কুল নিয়ে কথা বলুন। যেমন: বাচ্চাকে কোনো নতুন স্কুলে যেতে হচ্ছে, স্কুলে গেলে তার কি লাভ হবে, স্কুলের টিচার কেমন হবে, বন্ধু বান্ধব বা ক্লাস মেইট কারা হবে কি রকম হবে, স্কুলের রুটিন কি ইত্যাদি। আলাপচারিতার মাধ্যেমে জানার চেষ্টা করুন নতুন স্কুল নিয়ে আপনার বাচ্চার ভাবনা কি? সে কি কোনো ধরণের হতাশায় ভুগছে , দু: চিন্তা বা অস্বস্তিকর মনে করছে। যদি কোন ধরণের হতাশা বাচ্চার মধ্যে লক্ষ্য করেন তা হলে একান্ত আলাপচারিতার মধ্যেমে সে হতাশা দূর করার চেষ্টা করুন। তাকে বুঝাতে সক্ষম করুন এটা তার জন্য কতোটা জরুরী এবং আপনিও একসময় তার মতো ছিলেন এবং ধীরে ধীরে এ পর্যায়ে এসেছেন।
২) নতুন স্কুলের সাথে বাচ্চাকে পরিচিত করতে, বাচ্চাকে সাথে নিয়ে স্কুল ভিজিট করে ক্লাস টিচার, ক্লাসরুম এবং স্কুলের ভেতর এবং প্লেগ্রাউন্ড পরিদর্শন করুন। সম্ভব হলে ক্লাস টিচারের কাছ থেকে স্কুল এবং ক্লাসরুমের বিভিণ্ন একটিভিটির কিছু ছবি সংগ্রহ করুন। বিভিন্ন স্কুল বাচ্চাদের সেটেল হতে সমস্যা না হওয়ার জন্য টানজিসন বুক প্রদান করে। যাতে করে বাচ্চরা বাবা মায়ের সাথে বসে ঐ বুক দেখে এবং স্কুলের সাথে গভীরভাবে পরিচিত হতে পারে।
৩) সম্ভব হলে সপ্তাহে দু একবার বাচ্চাকে সাথে নিয়ে নতুন স্কুলের সামনের রাস্তা দিয়ে হাটাহাটি করুন। গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে ভেতরের দৃশ্য বাচ্চাকে দেখিয়ে স্কুল সম্বন্ধে কথা বলুন। তাকে বলুন সে কিছুদিনের মধ্যে এই গেইট দিয়ে এই স্কুলে যাবে, সময়টা বড় আনন্দদায়ক হবে, নতুন বন্ধুবান্ধবের সাথে খেলা করবে ইত্যাদি। তাছাড়া বাসায় যদি কম্পিউটার থাকে মাঝেমধ্যে বাচ্চাকে সাথে নিয়ে স্কুল ওয়েভসাইটে স্কুলের বিভিণ্ন একটিভিটির ছবি দেখুন। এতে করে বাচ্চা যখন স্কুলে যাবে তখন তার কাছে নতুন স্কুল অপরিচিত মনে হবে না।
৪) নতুন স্কুলে সেটেল হওয়ার জন্য বাচ্চাদের বিভিণ্ন ধরণের বই পাওয়া যায় যেমন; 'মাই নিউ স্কুল,' গোয়িং নিউ স্কুল,'স্টাটিং স্কুল' ইত্যাদি। বাচ্চাকে সাথে নিয়ে নিয়মিত ঐ বইগুলো পড়ুন এবং বাচ্চার সাথে তার নতুন স্কুল নিয়ে কথা বলুন। স্কুলের যদি ইউনিফর্ম থাকে তা হলে বাচ্চা স্কুলে যাবার কিছুদিন পূর্বে মাঝে মধ্যে বাসায় সামান্য সময়ের জন্য ইউনিফর্ম পরিয়ে অভ্যস্ত করুন। এতে করে বাচ্চা স্কুলে প্রথম দিন ইউনিফর্ম পরে গেলে অস্বস্তিকর লাগবে না।
৫) স্কুল শুরু করার প্রথম কয়েক সপ্তাহ বাচ্চাকে বেশি করে সময় দিন। তাকে বুঝতে দিন আপনি খুব খুশি তার নতুন স্কুলে পদার্পণ করায়। স্কুল থেকে ফেরার পথে বাচ্চার সাথে স্কুল নিয়ে কথা বলুন। যেমন: তার দিনটি কেমন ছিলো, সে কি খেলো, কি কি একটিভিটি করলো, নতুন কোন বন্ধু পেয়েছে কি না, যদি পেয়ে থাকে তাহলে সে কেমন ইত্যাদি। সে সময় আপনার স্কুলজীবনের মধুর কোন স্মৃতি চাইলে তার সাথে শেয়ার করুন।
৬) বাচ্চাকে নিয়মিত প্রশংসা করুন। তার ছোট ছোট এচিভমেন্টগুলো সেলিব্রেট করুন। তাকে স্কুলে যাবার জন্য উসাহিত করুন এ বলে যে সে যদি নিয়মিত স্কুলে যায় কান্নাকাটি না করে তা হলে তাকে আপনি বাইরে কোথাও নিয়ে যাবেন অথবা তার পছন্দের কোন কিছু উপহার দিবেন। বাচ্চাকে প্রতিদিন স্কুলে যাবার জন্য উৎসাহিত করতে বাড়ি ফেরার পর তাকে একটি স্টিকার প্রদান করুন। সম্ভব হলে বাচ্চার রুমে একটি সাপ্তাহিক রিওয়ার্ড চ্যাট ব্যবহার করতে পারেন।
৭) অনেক বাচ্চারা প্রথম কয়েক সপ্তাহ স্কুলের খাবার খেতে অনিহা প্রকাশ করে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার তারা খায় না বা খেতে চায় না। এতে করে বাচ্চারা খুব টায়ার্ড থাকে এবং ক্লাসে লেসনগুলোতে মনোযোগী হয় না। আপনার বাচ্চা যদি স্কুলে প্যাক লাঞ্চ নিয়ে যায়, তাহলে তার পছন্দের খাবার প্যাকলাঞ্চে ভরে দিবেন। এতে করে সে লাঞ্চটাইমে খাবার খেতে অনিহা প্রকাশ করবে না, বরং অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে খাবার খেতে এনজয় করবে।
৮) বাচ্চাকে সময় মতো রাতে ঘুমাতে দিবেন যাতে বাচ্চার পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম এবং বিশ্রাম বাচ্চার শারীরিক এবং মাসসিক উন্নতির জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। এতে করে বাচ্চার মষ্তিষ্ক বৃদ্ধি পায়, স্মৃতিশক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, রক্তে সুগার লেবেল এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে, দৈনন্দিন কর্মকান্ডে বেশি করে সক্র্রিয় হতে সাহায্য করে এবং মেজাজা ফরফুরে ও সতেজ থাকে। বাচ্চাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম এবং ঘুম হলে তারা বিভিন্ন রকমের অসুস্থতায় ভোগার সম্ভাবনা তাকে।
আশা রাখি এ বছর সেপ্টেম্বরে যাদের বাচ্চারা ষ্কুলে যাবে তাদের নতুন স্কুলে টানজিসন এবং সেটেলিং প্যারিয়ডের সময় উপরের টিপসগুলো কাজে আসবে। যে সব বাচ্চারা নতুন স্কুলে পদার্পন করছে তাদের সবার প্রতি শুভ কামনা।






